
এসএসসি পরীক্ষার্থীরা যেসব ভুল বারবার করে — তুমি করছো না তো?
SSC পরীক্ষা — শিক্ষা জীবনের একটি বড় বোর্ড এক্সাম। সবাই চিন্তা করি , “এই পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতেই হবে!” কিন্তু একটা ব্যাপার জানো? অনেকেই প্রচুর পড়েও কিছু ছোট ভুলের কারণে কাঙ্ক্ষিত গ্রেড পায় না!
চলো জেনে নেই, এই ভুল গুলো কি কি!
Mistakes Made During Preparation (প্রস্তুতির সময়ের ভুল)
SSC পরীক্ষার প্রস্তুতি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি ধাপে নিয়ম ও ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী কঠোর পরিশ্রম করেও কিছু সাধারণ ভুলের কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল পায় না।
পরিকল্পনা ছাড়া পড়া শুরু করা, সিলেবাস না দেখা, রিভিশন বাদ দেওয়া, সময়ের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করা— এসব ভুলই প্রস্তুতির গতি কমিয়ে দেয়।
তাছাড়া মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটানো বা অস্থির মনোভাবও পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
নিয়মিত রুটিন মেনে পড়া, সঠিক সিলেবাস জানা এবং বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে এই ভুলগুলো সহজেই এড়িয়ে চলা যায়।
এই অংশে আলোচনা করা হয়েছে SSC পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় যেসব ভুলগুলো শিক্ষার্থীরা করে ফেলে এবং কীভাবে সেগুলো সংশোধন করা যেতে পারে।
সব টপিক কভার করার তাড়া
আমরা অনেকেই ভাবি, যত বেশি টপিক পড়ব, তত প্রস্তুতি ভালো হবে। এটি পুরোপুরি ভুল নয় — কারণ SSC পরীক্ষার মতো বড় পরীক্ষায় ফুল সিলেবাস কাভার করাটা জরুরি। তবে সমস্যা হয় তখন, যখন বোর্ড পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে, আর তখনও আমরা নতুন টপিক শুরু করি পুরোনো টপিক রিভিশন বাদ দিয়ে।
সারা বছর ধরে অবশ্যই ফুল সিলেবাসের ওপর প্রিপারেশন রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু পরীক্ষার সময় যত কাছে আসবে, তত বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রিভিশনে। কারণ তখন নতুন বিষয় পড়লে মনে রাখা কঠিন হয়, বরং আগের পড়া বিষয়গুলোই ঝালিয়ে নেওয়া বেশি কার্যকর।
এমন অনেক বিষয় আছে, যেগুলো একবার পড়ে রেখে দিলে ভুলে যাওয়ার সুযোগ বেশি। তাই সেগুলো বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে শক্ত করে নিতে হবে। বিশেষ করে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, বা ইংরেজি গ্রামারের মতো টপিকে রিভিশনই হলো আসল প্রস্তুতির শুরু।
সিলেবাস না দেখে হুট করে পড়া শুরু করা
তোমরা যারা SSC’26 পরীক্ষার্থী, তোমাদের কিন্তু শর্ট সিলেবাসের ওপরই পরীক্ষা হবে। তাই প্রস্তুতি শুরু করার আগে অবশ্যই শর্ট সিলেবাসটা দেখে বইয়ের চ্যাপ্টারগুলো দাগিয়ে নেবে।
গুগলে গিয়ে “SSC 2026 Short Syllabus” লিখে সার্চ দিলেই সাবজেক্টভিত্তিক সিলেবাস পেয়ে যাবে।
বইয়ের যেসব অধ্যায় বাদ গেছে, সেগুলোতে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। আগে বুঝে নাও কোন টপিকগুলো সিলেবাসে আছে, তারপর সেগুলোকেই টার্গেট করে পড়া শুরু করো।
পরীক্ষার মানবণ্টন / মানবণ্টনের পরিবর্তন না জানা
২০২৬ সালের SSC পরীক্ষায় সিলেবাসের পাশাপাশি কিন্তু মানবণ্টনেও পরিবর্তন এসেছে। যেমনঃ
বাংলা ২য় পত্রে: রচনামূলক অংশের অনুবাদ প্রশ্ন (১০ নম্বর) বাদ দিয়ে সেই ১০ নম্বর সংবাদ প্রতিবেদন অংশে যুক্ত হয়েছে।
আইসিটি বিষয়ে: সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন (১০ নম্বর) বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই ১০ নম্বর বহুনির্বাচনি প্রশ্নে যোগ হয়ে এখন মোট ২৫ নম্বর বহুনির্বাচনি প্রশ্ন থাকবে।
ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে: ফিন্যান্স থেকে ৮টি ও ব্যাংকিং থেকে ৭টি, মোট ১৫টি সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন থাকবে; পরীক্ষার্থীকে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, তবে এক বিভাগ থেকে অন্তত ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানতে অবশ্যই https://nctbbook.com/ ওয়েবসাইটে চোখ রাখবে।
অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার
আমরা শিক্ষা জীবনে নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য মোবাইল ফোনের ওপর নির্ভরশীল। তবে মনের অজান্তেই রিলস দেখা, ফেসবুক স্ক্রল করা বা ইউটিউবে ভিডিও দেখতে দেখতে অনেক সময়ের অপচয় হয়ে যায়। এতে পড়ায় মনোযোগ নষ্ট হয় এবং প্রস্তুতির গতি কমে যায়। তাই পড়ার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখবে এবং প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করবে না। সময়ের সঠিক ব্যবহারই ভালো ফলাফলের মূল চাবিকাঠি।
Mistakes To Avoid During Exams (পরীক্ষার সময়ের ভুল)
পরীক্ষার আগের দিন সারা রাত জেগে পড়া
এক্সামের আগে মস্তিষ্কেরও বিশ্রামের দরকার হয়। সারারাত জেগে পড়লে ব্রেইন ক্লান্ত হয়ে যায়, ফলে পরীক্ষার হলে মাথা ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জানা জিনিসও তখন মনে করতে পারবে না, আর এই ছোট ভুলেই A+ মিস হয়ে যেতে পারে। তাই এক্সামের আগের দিন হালকা রিভিশন করো, তারপর পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে পরের দিন সতেজভাবে পরীক্ষায় অংশ নাও।
বুঝেছি — তুমি চাও ইন্টারঅ্যাকশন যেন একদম কম হয়, ভাষা সরল, তথ্যভিত্তিক ও নির্দেশনামূলক থাকে। নিচে সে অনুযায়ী সংস্কার করা হলো
প্রশ্ন না বুঝে উত্তর লেখা
সময় বাঁচানোর চিন্তায় তোমরা অনেকেই তাড়াহুড়ো করে প্রশ্ন পড়ো, কিন্তু কী জানতে চেয়েছে তা বুঝতে পারো না । ফলে সহজ প্রশ্নের উত্তর ও ভুল দিয়ে ফেলো। এই ভুল এড়াতে প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে আগে বুঝে নিতে হবে কোন টপিক থেকে এসেছে, তারপর উত্তর দিতে হবে।
কঠিন প্রশ্নে বেশি সময় নষ্ট করা
তোমরা অনেকেই ভাবো, শুরুতে কঠিন প্রশ্নের উত্তর করলে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। কিন্তু এটি খুব বড় ভুল। কঠিন প্রশ্নে সময় বেশি লাগে, এবং মাঝপথে আটকে গেলে মনোযোগ নষ্ট হয়। এর ফলে বাকি প্রশ্নগুলো ঠিকভাবে লিখে আসা যায় না। তাই সহজ প্রশ্নগুলো আগে শেষ করো, এরপর কঠিন প্রশ্নে সময় দাও।
যে প্রশ্নগুলো একদম নিশ্চিতভাবে পারো, সেগুলো দিয়েই শুরু করা সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এমসিকিউ প্রশ্ন সিরিয়ালি আন্সার করা
সিরিয়ালি আন্সার করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং তুমি রাউন্ড সিস্টেমে আগাতে পারো। প্রশ্ন পেয়েই আগে একদম শিওর এমসিকিউগুলো আগে দাগিয়ে নাও, এরপর যেগুলো নিয়ে তুমি একটু কনফিউসড সেগুলো দ্বিতীয় রাউন্ডে দাগাও।
তবে মনে রাখবে, এমসিকিউতে যেহেতু নেগেটিভ মার্কিং নেই, তাই কোনো প্রশ্ন না দাগিয়ে আসবে না। কাছাকাছি উত্তর বিবেচনা করে দাগানোই উত্তম।
খাতা রিভিশন দেয়ার জন্য সময় না রাখা
লেখা শেষ মানেই পরীক্ষা শেষ নয়। অবশ্যই খাতা রিভিশনের জন্য কিছু সময় রাখতে হবে।
রিভিশনের সময় খেয়াল রাখবে —
- প্রশ্ন নম্বর ঠিক আছে কিনা।
- সৃজনশীল প্রশ্নগুলোতে ৪টি অংশের উত্তর দিয়েছো কিনা; তোমরা অনেক সময় ‘গ’ উত্তর করার পর ‘ঘ’ উত্তর করতে ভুলে যাও।
- বানান ও ম্যাথ ক্যালকুলেশন ঠিক আছে কিনা তা রিচেক করবে।
ম্যাক্সিমাম সময়েই দেখা যায় রিভিশনের সময় ছোট ছোট ভুল ধরা পড়ে। তাই পরীক্ষার শেষের কয়েক মিনিট রিভিশনের জন্য রেখে দেওয়া একদম মাস্ট।
পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা (In-Exam Time Management)
অনেক শিক্ষার্থী একটি সৃজনশীল প্রশ্ন খুব ভালোভাবে লিখতে গিয়ে বাকি প্রশ্নগুলোর জন্য সময় পায় না। ফলে উত্তর ভালো জানলেও পুরো নম্বর ওঠে না। তাই পরীক্ষার শুরুতেই ঠিক করে নাও কোন অংশে কত সময় ব্যয় করবে। এক প্রশ্নে বেশি সময় নেওয়া ঠিক নয়। এজন্য আগেভাগে লিখিত পরীক্ষার অনুশীলন করা প্রয়োজন। প্রতিটি সৃজনশীল প্রশ্ন ২০ মিনিটের মধ্যে শেষ করার অভ্যাস তৈরি করো, এতে সময় নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং পুরো প্রশ্নপত্র শেষ করা সম্ভব হবে।
পরীক্ষার দিন সকালে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছানো
পরীক্ষার দিন সকালে তাড়াহুড়োয় ভুল হতেই পারে, কারণ তখন তুমি পরীক্ষার চিন্তায় বেশি ব্যস্ত থাকো। কিন্তু অ্যাডমিট কার্ড, ক্যালকুলেটর, ইরেজার বা পেন্সিলের মতো প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর যেকোনো একটি না নিয়ে গেলে এক্সামে বড় সমস্যায় পড়তে পারো। তাই অবশ্যই চেষ্টা করবে আগের দিন রাতেই সব কিছু গুছিয়ে রাখতে।
Psychological Mistakes To Avoid (মানসিক ভুল)
অতিরিক্ত ভয় বা মানসিক চাপ নেওয়া
আমরা অনেক কষ্ট করে SSC পরীক্ষার প্রস্তুতি নেই, কিন্তু এক্সাম হলে গিয়ে মানসিক চাপ আর ভয় সবকিছু গুলিয়ে ফেলে। ফলে জানা উত্তরও মনে থাকে না। তাই মাথা ঠান্ডা করে নিজের প্রস্তুতির ওপর বিশ্বাস রাখবে এবং পুরো ফোকাস রাখবে প্রশ্নের ওপর — নিজের সেরাটা দাও, ফলাফল নিজের জায়গা থেকেই আসবে।
Friend এর স্টাডি প্ল্যান নিয়ে গবেষণা করা
স্কুল টপার বা ক্লোজ ফ্রেন্ড দিনে ১৪ ঘণ্টা পড়ছে শুনে ফ্রাস্ট্রেশন বাড়ানোর চেয়ে নিজে পার্সোনাল প্ল্যান বানাতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি তুমি ধারণা রাখতে পারো কোন কোন বিষয় এখনো তোমার না জানা আছে এবং আরো পড়তে হবে।
পরীক্ষা শেষে বন্ধুর সাথে উত্তর মেলানো
অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে বসে উত্তর মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এটি এক ধরনের সাধারণ অভ্যাস হলেও এর প্রভাব নেতিবাচক। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর উত্তর মেলানোর ফলে নিজের প্রতি সন্দেহ তৈরি হয় এবং পরবর্তী পরীক্ষার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। যে পরীক্ষাটি শেষ হয়েছে তা নিয়ে চিন্তা না করে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেওয়া বেশি ফলপ্রসূ। সঠিক মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে পরীক্ষা শেষে বিশ্লেষণের পরিবর্তে বিশ্রাম ও মানসিক প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
উপসংহার
SSC পরীক্ষা শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যেখানে সাফল্য নির্ভর করে দুইটি মূল ধাপের ওপর, সেগুলো হলো — প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা কিভাবে দিয়েছো। প্রস্তুতির সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়া, নিয়মিত রিভিশন করা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখা সবচেয়ে জরুরি। পরীক্ষার দিনে দরকার মনোযোগ, সময় ব্যবস্থাপনা এবং শান্তভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। আর পুরো সময়টাতে মানসিক স্থিরতা ধরে রাখা হলো ভালো ফলাফলের সবচেয়ে বড় উপায়। তবে কিছু কিছু ভুল থেকে নিজেকে সুধরিয়ে নিতেই হবে। সেগুলো হতে পারে প্রস্তুতিকালীন, পরীক্ষার হলের ভুল অথবা মানসিক চাপ বিষয়ক।
আর সব কথার শেষ কথা হলো— এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন অনেক অনেক প্র্যাকটিস। তোমরা, বৃত্ত অ্যাপ ব্যবহার ঘরে বসেই নিতে পারো এমসিকিউ-এর পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি। বিষয়ভিত্তিক, বোর্ড বা ক্যাডেটভিত্তিক লাইভ এক্সামগুলোতে অংশ নিয়ে যাচাই করে নিতে পারো তুমি কতটা এগিয়ে। এছাড়াও থাকছে ফাইনাল মডেল টেস্ট, যেখানে টপ করলেই পেয়ে যেতে পারো আকর্ষণীয় সব পুরষ্কার!
সবশেষে তোমাদের জন্য রইলো অনেক অনেক শুভকামনা — আত্মবিশ্বাস রাখো, নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাও, তুমি সফল হবেই।